ওয়েব ডেস্ক: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দ্বিতীয় সচিব (কাস্টমস পলিসি) মুকিতুল হাসানকে রাষ্ট্রীয় গোপন নথি ফাঁসের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করার পর এবার অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩-এর ৩ ও ৫ ধারায় মামলা করা হয়েছে। বুধবার রাতে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলাটি করেন এনবিআরের আরেক দ্বিতীয় সচিব (বোর্ড প্রশাসন-৪)। মামলার এজাহার বৃহস্পতিবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের শুল্ক-১ শাখার প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, চাকরির শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে মুকিতুল হাসানকে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৩৯(১) ধারা অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্তকালীন তিনি নিয়ম অনুযায়ী খোরপোষ ভাতা পাবেন। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে।
এজাহারে বলা হয়েছে, ‘আউটলুক বাংলাদেশ’ নামের একটি অনলাইন পোর্টাল ১৫ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশের মধ্যে সম্ভাব্য ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ চুক্তির খসড়া সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে উঠে আসে গোপন তথ্য, যা পরবর্তীতে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অথচ চুক্তিটি ছিল নন-ডিসক্লোজড এগ্রিমেন্টের আওতায় অত্যন্ত গোপনীয়।
তদন্তে দেখা গেছে, ৮ জুলাই এনবিআরের চেয়ারম্যানের দপ্তর থেকে মতামতের জন্য খসড়া চুক্তি বোর্ড প্রশাসন শাখায় পাঠানো হয়। সেখান থেকে যায় কাস্টমস পলিসি উইংয়ে। ৯ জুলাই মুকিতুল হাসান নথিটি গ্রহণ করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নথি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সাংবাদিককে সরবরাহ করেন।
বাংলা আউটলুকের হাতে আসা ২১ পৃষ্ঠার গোপন নথিতে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক আলোচনা ছাড়িয়ে বাংলাদেশের করনীতি, নিরাপত্তা, ডিজিটাল বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ আইন ব্যবস্থায় গভীর হস্তক্ষেপের সুযোগ চাইছে।
খসড়ার মূল শর্তগুলোর কয়েকটি হলো-
১। মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক পণ্য আমদানি বাড়ানো এবং চীনা প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জাম সীমিত করা।
২। বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ, বন্দর ও শিপিং খাতে মার্কিন নিয়ন্ত্রণমূলক মানদণ্ড গ্রহণ এবং চীনা লজিস্টিক সিস্টেম (LOGINK) নিষিদ্ধ করা।
৩। রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে আইন সংশোধন এবং প্রয়োগে মার্কিন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
৪। মার্কিন পণ্য আমদানির সব কাস্টমস তথ্য যুক্তরাষ্ট্রকে সরবরাহ করা।
৫। ডিজিটাল নীতিমালায় পরিবর্তন: সাইবার সিকিউরিটি আইন সংশোধন, ওটিটি নীতিমালা বাতিল, মার্কিন প্রস্তাবিত গোপনীয়তা নীতি ও ডেটা শেয়ারিং সিস্টেম গ্রহণ।
৬। টেলিকম ও প্রযুক্তি খাতে ৬০০–৭০০ মেগাহার্টস স্পেকট্রাম মার্কিন মান অনুযায়ী উন্মুক্ত করা।
৭। মার্কিন কোম্পানির মুনাফা প্রত্যাবাসনে কোনো বাধা না দেওয়া, তেল-গ্যাস-ইনস্যুরেন্সে মালিকানা সীমা তুলে নেওয়া।
৮। অশুল্ক বাধা অপসারণ: ওষুধ, কৃষি, মোটরগাড়ি, মেডিকেল ডিভাইস আমদানিতে মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সনদ বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়া।
৯। মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত ১৩টি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে বাধ্যতামূলক যোগদান।
অন্তর্বর্তী সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান নিজেই স্বীকার করেছেন, “আলোচনা শুধু শুল্ক নয়, বরং একটি বৃহৎ ফ্রেমওয়ার্ক যেখানে যুক্তরাষ্ট্র তাদের জাতীয় নিরাপত্তা পর্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে।”
ফলে প্রশ্ন ওঠে কার স্বার্থে এই নন-ডিসক্লোজড চুক্তি?
অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কি বাংলাদেশের করনীতি, শ্রম আইন ও ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব মার্কিন শর্তে বদলে দিতে রাজি?
৩৫% পাল্টা শুল্ক এড়াতে কি দেশের নীতি ও নিরাপত্তা কাঠামোতে হস্তক্ষেপের অনুমতি দেওয়া হবে?
গোপনীয়তার চুক্তি থাকলেও জনগণের জানার অধিকার কি এভাবে খর্ব করা যায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল শুল্কবিষয়ক চুক্তি নয়, একটি পরিকল্পিত নীতিগত আগ্রাসন, যা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে।
অন্যদিকে মুকিতুল হাসানের বিরুদ্ধে ১৯২৩ সালের উপনিবেশিক অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে মামলা আবারও প্রশ্ন তুলেছে- রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের কাছ থেকে তথ্য গোপন রাখা, নাকি তাদের জানার অধিকার নিশ্চিত করা? হুইসেলব্লোয়ারদের শাস্তি দেওয়া, নাকি নীতিগত স্বচ্ছতা আনা?